সংকটের মুখে চামড়া শিল্প: এ শিল্পকে রক্ষায় প্রয়োজন সরকার ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সমন্বয়।

এবারের কুরবানির ঈদে চামড়া কেনাবেচা নিয়ে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে চামড়া সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। ঈদ উল আযহার পশু কুরবানির পরেই বিকাল নাগাদ সাধারণত পশুর চামড়া চলে যায় চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে। এবারে হয়েছে এর ব্যতিক্রম। দেশের নানা স্থানে চামড়া বিক্রির ন্যায্য মূল্য না পেয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা পশুর চামড়া মাটিতে পুতে ফেলে প্রতিবাদ জানিয়েছে। সেই ছবি ব্যাপক ভাবে আলোচিত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে।

মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলছে সরকার নির্ধারিত যে দাম বেধে দিয়েছিল, তারচেয়ে অনেক কম দামে কিনতে যেয়ে নি:স্ব হতে হয়েছে তাদের।

চামড়ার এমন দরপতনের বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা একে অপরকে দোষারোপ করেন। মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা দোষারোপ করছেন পাইকারি ক্রেতাদের, পাইকারি ক্রেতারা বলছেন আড়তদাররা কম দামে চামড়া ক্রয় করছেন। আড়তদার বলছেন ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশন থেকে আমাদের বকেয়া পরিশোধ করেনি। যার ফলে, অর্থ সংকটে চামড়া ক্রয় করতে পারছেন না। সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কেউ কেউ আবার বলছেন সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমানো হয়েছে।

চামড়াজাত পণ্য বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি পণ্য হওয়া সত্ত্বেও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে শিল্পটি বিপন্ন হতে চলেছে। তৃণমূল পর্যায়ে বিক্রেতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার পেছনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সঙ্গে সিন্ডিকেটের দৌরাত্মও রয়েছে। এ দুইয়ের কারসাজিতে চামড়া শিল্প আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে।

প্রতি বছর দেশে উৎপাদিত ২২ কোটি ঘনফুট চামড়ার প্রায় অর্ধেকই ব্যবহৃত হচ্ছে না রফতানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনে। চামড়ার আন্তর্জাতিক ক্রেতাজোট লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ-এল ডব্লিউ জি’র ছাড়পত্র না থাকাই এর মূল কারণ। ট্যানারি মালিকরা বলছেন, সাভারে নতুন শিল্পনগরীই পারতো সব সংকট সমাধান করতে, যদিও তাদের দাবি বিসিকের গাফিলতিতে সংকট বেড়েছে আরও।

তবে শিল্পের অনগ্রসরতার পেছনে সরকারের অর্থনৈতিক কূটনৈতিক (ইকোনমিক ডিপ্লোমেসি) ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। পাশাপাশি মালিকপক্ষের চিন্তাধারায়ও পরিবর্তন আনার আহ্বান তাদের। গত পাঁচ বছরে চামড়ার দাম কমেছে অর্ধেক। বিপরীতে চামড়া এবং চামড়াজাত সব পণ্যের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। তাহলে কাঁচা চামড়ার দাম কমছে কেন, সেই উত্তর মিলছে না কোথাও।

নানা ধরনের রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয় চামড়া। যার বেশিরভাগই প্রস্তুত করা হয় বিদেশে রফতানির জন্য। তবে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসেবে, গত কয়েক বছরে দুর্বল হয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি খাত হিসেবে বিবেচিত চামড়া শিল্প।

বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে আয় হয় ১১৩ কোটি ডলার। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে রফতানি আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১১৬ কোটি ডলারে। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে এই আয়ের পরিমাণ আরও বেড়ে হয় ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

কিন্তু ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে রফতানি আয় অস্বাভাবিক কমে ১০৮ কোটি ৫৪ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। ওই অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১২ কোটি ডলার। আয় হয়েছে ১০১ কোটি ডলার। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এ ক্ষেত্রে আয় কম হয়েছে ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ।

গত বছরের একই সময়ের চেয়ে আয় কমেছে ৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে চামড়া খাত থেকে ৮৩ কোটি ৭১ লাখ ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। যদিও এ সময়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯১ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। এ হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৯ শতাংশ এবং আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ আয় কমেছে।

এবারও চামড়ার দাম বাড়ানো হয়নি। কিন্তু মূল্যস্ফীতি হিসেব করলে আসলে চামড়ার প্রকৃত মূল্য অনেক কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম ও চাহিদা দুটোই পড়ে যাচ্ছে। সেটার একটা প্রভাব বাংলাদেশের বাজারে পড়ছে। তবে এর মধ্যেও দেশজুড়ে চামড়া কেনাবেচায় যে দশ হাত বদল হয়, এটার সংখ্যা কমাতে আহ্বান জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাহলে আরেকটু সুবিধা পাওয়া যাবে। এজন্য সরকারকে নজরদারি বাড়াতে হবে। সাভারের মতো উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তুলতে হবে।

কয়েকবছর ধরে সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্প নগরীতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে ট্যানারি মালিকরা। এবারো কোরবানি মৌসুমে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে লবণজাত করছেন ব্যবসায়ীরা। এসব চামড়া কয়েকদিন পরই লবণ ছাড়িয়ে ধোয়া হবে ক্যামিকেল দিয়ে। সে সময় ট্যানারিগুলোতে পানির ব্যবহার বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। কিন্তু ট্যানারিগুলোয় ব্যবহৃত ক্রোমিয়াম যুক্ত পানি যাওয়ার জন্য সরু পাইপ ও ভঙ্গুর ড্রেনেজ ব্যবস্থা হওয়ায় রাস্তা জলমগ্ন হচ্ছে।

ড্রেনের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত না হয়ে নিচে যে পাইপ গেছে, সেই পাইপ ময়লা গেলে জ্যাম হয়ে যায়। তার কারণে এখানে পানি ভেসে উঠে। এতে মানুষের চলা ফেরায় অনেক সমস্যা হয়। রাস্তায় লাইট না থাকায় এখানে অন্ধকার হয়ে যায়। মানুষে চলাচলে খুবই সমস্যা হয়।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার, সিইটিপি নিয়ে অভিযোগ শেষ হয়নি ট্যনারিগুলোর। রয়েছে লোডশেডিং এর সমস্যাও। জেনারেটর ব্যবস্থা ভাল না হওয়ায় অনেক সময় বন্ধ থাকে সিইটিপির পরিশোধন কাজ। ব্যবসায়ীরা নানা সমস্যার কথা বললেও বিসিক বলছে, এখন পর্যন্ত ৯৯ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে সিইটিপির।

নিদিষ্ট সময়ে ঋণ না পাওয়া এবং নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়াতে কারখানা স্থানান্তরের পরেও অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যেতে পারেনি। এতে করে কয়েক হাজার কোটি টাকা রফতানি অর্ডার বাতিল হয়ে যায়। এতে করে এ খাতে রফতানি অনেক কমে যায়। এদিকে বেশিরভাগ ট্যানারি উৎপাদনে নেই। এছাড়া গত বছরের ৪০-৪৫ শতাংশ চামড়া এখনও অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে।

সব ট্যানারি রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে আগেই স্থানান্তর হয়েছে। প্রায় ২২৫টি কারখানা এ স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় বন্ধ হয়ে যায়। কিছু কারখানা পরে চালু হলেও ছোট-বড় দেড় শতাধিক ট্যানারি এখনো বন্ধ। একই অবস্থা চট্টগ্রামেও। বন্দরনগরীতে একসময় ২২টি ট্যানারি থাকলেও ২১টিই একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে চালু আছে মাত্র একটি, যার প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা ওই অঞ্চলে সংগৃহীত মোট চামড়ার ২০ শতাংশেরও কম। সব মিলিয়ে ট্যানারি সংকটে দুশ্চিন্তা বাড়ছে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ নিয়ে।

ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা থাকলেও সক্ষমতার অভাবে আমরা তা দিতে পারছি না। আমাদের জন্য শিল্পনগরী দেয়া হলেও সেটি প্রস্তুত নয়।

পরিস্থিতির কারণে গতবারের চামড়াই এখনো প্রক্রিয়াজাত করতে পারিনি। এতে সংগৃহীত কাঁচা চামড়ার গুণগত মান কমে যাচ্ছে। নতুন চামড়া সংরক্ষণে স্থান সংকট রয়েছে। অনেক ট্যানারি এখনো উৎপাদনে যায়নি। এসব কারণে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ নিয়ে দুশ্চিন্তা এবারো থাকছে।

জানা গেছে, সাভারের চামড়া শিল্পনগরী এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত হতে পারেনি। চালু করা যায়নি স্থানান্তরিত সব ট্যানারি। খালি নেই চামড়া শিল্পনগরীর ডাম্পিং ইয়ার্ডও। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) প্রস্তুত তো হয়নি, চামড়া কাটার পর বর্জ্য কোথায় ফেলা হবে, নির্ধারণ হয়নি সেটিও। চামড়া শিল্পনগরীতে ট্যানারি আছে বর্তমানে ১৫৫টি। এর মধ্যে ১১৫টি উৎপাদনে সক্ষম।

যদিও ঢাকার ট্যানারিগুলোর চামড়া প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতাও কমে গেছে। সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্পনগরীতে ট্যানারি স্থানান্তরের ধাক্কা তারা এখনো সামলে উঠতে পারেননি বলে দাবি এ খাতের ব্যবসায়ীদের। হাজারীবাগের অনেক ট্যানারি বন্ধ হলেও এখনো চালু হয়নি সেগুলো।

সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরে বড় ধরনের বিনিয়োগের ধাক্কায় পড়েছে অনেক ট্যানারি। এ ধাক্কা কটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগবে। ব্যবসা ভালো না যাওয়ায় অনেক ট্যানারি গতবার চামড়া কিনতে নেয়া ঋণের অর্ধেকও পরিশোধ করতে পারেনি। ট্যানারি মালিকদের সক্ষমতা বাড়াতে অর্থায়ন ঘাটতি দূর করার বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের কোরবানির ঈদে চামড়া সংগ্রহের জন্য দেয়া প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ঋণের বেশির ভাগই আদায় হয়নি। যদিও এবার কোরবানির পশুর চামড়া কিনতে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক থেকে ট্যানারি মালিকদের ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। গত বছরের ঋণের অর্থ আদায় না হওয়ায় এ ঋণ বিতরণ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়।

বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্যের প্রধান ক্রেতাদের অন্যতম চীন। এবারে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। চীন কম দামে পণ্য কেনার আল্টিমেটাম দিয়েছে। তাই কোনোভাবেই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কাঁচা চামড়া কেনা সম্ভব নয়। এছাড়া নতুন ট্যানারি নির্মাণ করায় পুঁজির সংকটে আছে ট্যানারি মালিকরা। এবারে ৪২টি ট্যানারি কাঁচা চামড়া কিনতে ৬০১ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ পেয়েছে। বাকিরা কী করবে?

কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রিতে একটি চেইন আছে। ট্যানারির মালিকরা দাম কম দিলে অন্যরাও কম দিতে বাধ্য হয়। তবে ট্যানারি মালিকরা বিশ্ববাজারে ভালো দামে বিক্রি করে মোটা অঙ্কের বাণিজ্য করলেও আড়তদার, চামড়া সংগ্রহকারীদের সে সুযোগ থাকে না।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চামড়া শিল্পকে রক্ষা করতে হলে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। চামড়ার দাম নিয়ে সিন্ডিকেটের কারসাজি বন্ধ করতে হবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here