৩০০ বছর পর বিশ্বখ্যাত বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ‘মসলিন’ কাপড় আবারো  ফিরে আসছে….!!!

৩০০ বছর পর বিশ্বখ্যাত বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ‘মসলিন’ কাপড় আবারো  ফিরে আসছে  বলে আশা প্রকাশ করেছেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম

বাঙালিরা তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের যে সামান্য কিছু বিষয় বা বস্তু নিয়ে গর্ববোধ করত এবং এখনো করে তাদের মধ্যে প্রধানতম হল মসলিন কাপড়। ভারতের মুঘল রাজপরিবার তো বটেই এমনকি ব্রিটিশ রাজরানীদেরও নাকি প্রথম পছন্দের কাপড় ছিল ঢাকাই মসলিন।

বাংলা মসলিন শব্দটি আরবি, ফার্সি কিংবা সংস্কৃতমূল শব্দ নয়। মসলিন শব্দটি এসেছে `মসূল` থেকে। ইরাকের এক বিখ্যাত ব্যবসাকেন্দ্র হলো মসূল। এই মসূলেও অতি সূক্ষ্ণ কাপড় প্রস্তুত হতো। এই `মসূল` এবং `সূক্ষ্ণ কাপড়` -এ দুয়ের যোগসূত্র মিলিয়ে ইংরেজরা অতিসূক্ষ্ণ কাপড়ের নাম দেয় `মসলিন`। অবশ্য বাংলার ইতিহাসে `মসলিন` বলতে বোঝানো হয় তৎকালীন ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে উৎপাদিত অতি সূক্ষ্ণ একপ্রকার কাপড়কে।

কিংবদন্তি রয়েছে যে, মসলিন কাপড় এত মিহি ছিল  ৪০ হাত লম্বা ও ২ হাত চওড়া এমন একটি কাপড় একটা ছোট আংটির মধ্যে দিয়ে অনায়াসে চালাচালি করা যেত । মুঘল আমলে সতেরো শতকে মসলিন শিল্প বিকাশ লাভ করেছিল ঢাকার সোনারগাঁ আর আশপাশের অঞ্চলে। এ কারণে এটি ঢাকাই মসলিন বলে পরিচিত ছিল। এই মসলিন রপ্তানি হতো ইউরোপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।

সোনালি ঐতিহ্যের সেই মসলিন আবার ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মসলিন তৈরির প্রযুক্তি উদ্ঘাটিত হয়েছে জানিয়ে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম সোমবার নিজ দফতরে সাংবাদিকদেরকে জানান ‘বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বিশ্বখ্যাত ‘মসলিন’ কাপড় তৈরির প্রযুক্তি পুনরুদ্ধার হয়েছে। শিগগির এ কাপড় আবার উৎপাদন শুরু হবে।প্রথম মানসম্মত তৈরি মসলিনের শাড়ি প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিকে সুখবর দেয়া হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও মসলিনের হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসবে।’

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে সোনালি ঐতিহ্যের মসলিন তৈরির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। পরে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয় বাংলাদেশের সোনালি ঐতিহ্য মসলিনের সুতা তৈরির প্রযুক্তি ও মসলিন কাপড় পুনরুদ্ধার (প্রথম পর্যায়)।

মসলিনের সুতা তৈরির প্রযুক্তি ও মসলিন কাপড় বুননের বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সের পরিচালক ও বায়োটেকনোলজি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মনজুর হোসেনের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করে দেয়া হয়।

দলের সদস্যরা হলেন : রাবির অ্যাগ্রোনমি অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এম ফিরোজ আলম, টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের বুটেক্সের ডিন আলীমুজ্জামান, তুলা উন্নয়ন বোর্ডের একজন ও তাঁত বোর্ডের দু’জন কর্মকর্তা। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনে আরও তিনজন সদস্য এ বিশেষজ্ঞ দলে কাজ করছেন।

সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত ৭ অক্টোবর বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের সভাকক্ষে বিশেষজ্ঞ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান গবেষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মনজুর হোসেন, তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আস্রাফ আলীসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় জানানো হয়, ইতিমধ্যে মসলিনের ৪টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মসলিন তৈরির প্রযুক্তি পুনরুদ্ধারের জন্য যেসব তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন তা উদ্ঘাটন করা হয়েছে।

যে সুতা থেকে মসলিন তৈরি হতো, সেই ফুটি কার্পাস তুলাগাছ চাষ হচ্ছে দেশেই। শিগগির ওই গাছের তুলা থেকে মসলিন কাপড়ের শাড়ি বা স্কার্ফ তৈরি করা হবে। ওই শাড়ি বা স্কার্ফ প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সুখবর জাতিকে জানাবে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

প্রায় ২৮ প্রকারের মসলিনের মধ্যে জামদানি এখনও ব্যাপক আকারে প্রচলিত। নানা কারণে আঠারো শতকের শেষার্ধে বাংলায় মসলিন তৈরি বন্ধ হয়ে যায়। কথিত আছে যে মসলিনে তৈরি করা পোশাকসমূহ এতই সূক্ষ্ম ছিল যে ৫০ মিটার দীর্ঘ মসলিনের কাপড়কে একটি দিয়াশলাই বাক্সে ভরে রাখা যেত।

ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর উনবিংশ শতাব্দীতে স্থানীয়ভাবে তৈরি করা বস্ত্রের ওপরে ৭০-৮০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়, যেখানে ব্রিটেনে তৈরি করা আমদানিকৃত কাপড়ের ওপরে মাত্র ২-৪ শতাংশ কর ছিল। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের তাঁত শিল্পে ধস নামে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here